নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গন। একদিকে বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীকে ঘিরে দলীয় হিসাব-নিকাশ, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের তৎপরতা — সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগেই জমে উঠেছে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মেয়র পদে বিএনপির অন্তত ৮ জন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তাঁরা হলেন — বর্তমান সিটি করপোরেশন প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির ১ নং সদস্য আলহাজ্ব আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ, বরিশাল-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু, জেলা দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব এবায়েদুল হক চান, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, একাধিকবার নির্বাচিত কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির এবং মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একক প্রার্থী অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল্লাহ নাসির এবং এনসিপির একক প্রার্থী এম. আনোয়ার হোসেন সিকদারকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে জোরালো আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া বাসদের একক প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ডা. মনীষা চক্রবর্তী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন বড় প্রশ্ন — বিএনপি শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থী দিতে পারবে, নাকি একাধিক প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হবে? চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত ভোটের সমীকরণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় আনোয়ার সিকদার
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছেন বরিশাল মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এম. আনোয়ার হোসেন সিকদার। এনসিপি সভাপতি নাহিদ ইসলাম গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত দলীয় কর্মসূচিতে তাঁকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
আনোয়ার সিকদারের আলোচনার মূল বিষয় তাঁর প্রস্তাবিত নগর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা। প্রচলিত নগর ব্যবস্থাপনার গণ্ডি পেরিয়ে বরিশালকে দক্ষিণ বাংলার একটি আধুনিক বাণিজ্যিক, শিল্প ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন তুলে ধরছেন তিনি।
তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কীর্তনখোলা নদী। তিনি মনে করেন, নদীর দুই তীরকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে বরিশালের অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে:
– কীর্তনখোলা নদীর দুই তীরে আধুনিক রিভারফ্রন্ট, বাণিজ্যিক রিসোর্ট, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো ও বিনোদন কেন্দ্র
– নদীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি
– শিল্পকারখানা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণ
– বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, দাতা দেশ ও দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা
এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ধারণার সঙ্গে তিনি একমত। তাঁর মতে, একটি শহরের উন্নয়ন শুধু সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, “আমি মেয়র নির্বাচিত হলে শুধু সিটি করপোরেশনের প্রচলিত কাজের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। বরিশালের উন্নয়নে একটি সমন্বিত উন্নয়ন ফোরাম গঠন করতে চাই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সরকারি দপ্তর, উন্নয়ন সংস্থা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের এক জায়গায় এনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেব।”
তাঁর ভাষায়, “বরিশালের উন্নয়নকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। দক্ষিণ বাংলার প্রবেশদ্বার হিসেবে বরিশালকে গড়ে তুলতে পারলে শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
৩০ ওয়ার্ডে সমন্বিত উন্নয়নের ভাবনা:
বরিশাল সিটি করপোরেশনের আয়তন প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার। এখানে রয়েছে ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ১০টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদ। এই বিশাল নগর এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক চাহিদা, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবছেন আনোয়ার সিকদার।
তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আরও রয়েছে — আধুনিক ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা নিরসন ব্যবস্থা, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও সম্পদ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই, নিরাপদ সড়ক, ফুটপাত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়ণ, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা, আধুনিক বাণিজ্যিক অঞ্চল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, যুবসমাজের জন্য শিল্প ও ব্যবসাভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও স্বচ্ছ নগর প্রশাসন।
তিনি মনে করেন, বরিশালের অনেক বড় উন্নয়ন প্রকল্প সরাসরি সিটি করপোরেশনের একক এখতিয়ারভুক্ত নয়। নদী ব্যবস্থাপনা, বন্দর, শিল্পায়ন, বৃহৎ যোগাযোগ অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মতো বিষয় বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে একজন মেয়রের দায়িত্ব শুধু দৈনন্দিন সেবা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং সমন্বিত উন্নয়ন ফোরাম গঠন, প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি, অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধান এবং বাস্তবায়ন তদারকির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।